বুধবার সুপ্রিম কোর্ট অত্যন্ত কঠোর ভাষায় মমতার রাজ্য সরকারকে তীব্র ভর্ৎসনা করেছে। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, এই মামলার শুনানি আর কোনোভাবেই মুলতবি করা হবে না। শীর্ষ আদালত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে দায়ের করা শুনানির মুলতবি চেয়ে করা আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে।

বুধবার সুপ্রিম কোর্টে আই – প্যাক কর্তা প্রতীক জৈনের বাড়িতে ইডির তল্লাশি অভিযানের সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এসে ইডি কাছ থেকে সমস্ত নথি ও ডক্যুমেন্ট ,মোবাইল ছিনিয়ে যাওয়া , মামলার শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্ট মমতার রাজ্য সরকার কে তীব্র ভৎসনা করে। বুধবার শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিল, এই মামলার শুনানি আর পিছোবে না। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে করা স্থগিতের আবেদন সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে শীর্ষ আদালত (I PAC Case Supreme Court)।
Table of Contents
রাজ্য সরকারের দাবী
রাজ্য সুপ্রিম কোর্টে আইপ্যাক মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলল । বুধবার সেই সঙ্গে রাজ্যের আইনজীবীরা তিনটি আইনি প্রশ্ন তুলে সওয়াল করেন বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্র এবং এনভি অঞ্জরিয়ার বেঞ্চে । প্রশ্ন(১) সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে ইডি কি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে পারে?(২) সরকারি সংস্থা হয়েও কি তারা মৌলিক অধিকার দাবি করতে পারে? (৩) তা ছাড়া, কেন্দ্রীয় সংস্থা হয়েও কী ভাবে ইডি সরকারের বিরুদ্ধেই মামলা করতে পারে?
সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র ও বিচারপতি এন ভি অঞ্জারিয়ার বেঞ্চে এদিন শুনানি চলাকালীন রাজ্যের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী শ্যাম দিবান সময় চেয়ে আবেদন করেন , তাঁর বক্তব্য ছিল, ইডি যে ‘রিজয়েন্ডার অ্যাফিডেভিট’ জমা দিয়েছে, তাতে নতুন কিছু অভিযোগ ও তথ্য যুক্ত হয়েছে। সেগুলির জবাব প্রস্তুত করতে সময় প্রয়োজন।

রাজ্যের আইনজীবী দিওয়ান এ দিন সুপ্রিম কোর্টে বলেন, ১৩১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে মামলা করতে পারত ইডি। অথবা এফআইআর করতে পারত তদন্তকারী সংস্থাটি। ইডির এক্তিয়ার স্মরণ করিয়ে দিয়ে দিওয়ান আরো জানান যে, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী ওই সংস্থাকে আর্থিক তছরুপ প্রতিরোধ আইন বা পিএমএলএ-তে কিছু দায়িত্ব এবং ক্ষমতা দেওয়া হলেও, মামলা করার অধিকার দেওয়া হয়নি। রাজ্যের আইনজীবীরা বলেন, সিবিআই, সিআইডি-সহ বেশ কয়েকটি তদন্তকারী সংস্থা তাদের কারও মামলা করার কোনও অধিকার নেই। এই সংস্থাগুলি পরস্পরের বিরুদ্ধে মামলা করতে থাকলে সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ এবং ভারসাম্য নষ্ট হবে বলে সওয়াল করেন তিনি।
রাজ্যের পক্ষ্যে আরেক আইনজীবী মেনাকা গুরুস্বামীও একই দাবি করেন যে , ইডির নথিতে নতুন তথ্য রয়েছে, তাই সময় প্রয়োজন।
রাজ্যের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টে আরও বলা হয়, লিখিত জবাব ছাড়াই যুক্তি পেশ করতে হলে তারা ‘হ্যান্ডিক্যাপড’ অবস্থায় পড়বে এবং বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী কপিল সিব্বল সুপ্রিম কোর্টে আরও বলেন, “ইডি আসলে চাইছে যেন সিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেয় আদালত । কিন্তু এমন দাবি করতে পারে না ইডি ।” মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত ইডির অভিযোগও খারিজ করে দেন তিনি। বিচারপতি বলেছিলেন, “ইডি অফিসারেরা হুমকির মুখে পড়েছেন।” তার প্রেক্ষিতে সিব্বল বলেন, “ধরুন, তাদের সত্যিই হুমকি দেওয়া হয়েছে, তা হলেও এখানে কোন মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে?” দিওয়ানের সুরেই আদালতে সিব্বলের প্রশ্ন, “প্রধানমন্ত্রীর অর্থ তছরুপ প্রতিরোধ আইনের বাইরে ইডির কোনও ক্ষমতা নেই। তবে তারা কোন মৌলিক অধিকারের দাবি করছে?”
ইডির দাবী
ইডির পক্ষের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা এই আবেদন তীব্রভাবে বিরোধিতা করেন। তাঁর সাফ বক্তব্যে আদালতকে তিনি জানান, চার সপ্তাহ আগেই ওই নথি জমা পড়েছে, ফলে রাজ্যের কাছে পর্যাপ্ত সময় ছিল জবাব দেওয়ার, কিন্তু রাজ্য জেনে বুঝে জবাব দেয়নি ,কারণ তারা এই শুনানি বিলম্ব করার চেষ্টা করছে।
ইডির পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা সুপ্রিম কোর্টে জানান, তাঁরা সিবিআই তদন্ত চাইছেন না, ইডির মূল অভিযোগ ছিল তল্লাশির সময় তাদের আধিকারিকদের নিরাপত্তা নিয়ে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, আইপ্যাক অফিসে অভিযানের সময় তাদের আধিকারিকরা হুমকির মুখে পড়েছিলেন এবং প্রশাসনিক স্তরে বিভিন্ন ভাবে তাদের বাধা দেওয়া হয়েছিল।

বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র বলেন
বিচারপতি মিশ্র বলেন, “মামলা করার অধিকার কার রয়েছে, তা নিয়ে সওয়াল করা হচ্ছে? মুখ্যমন্ত্রী যদি তদন্তে ঢুকে পড়েন, তা হলে ইডি কী করবে? এর পরে তো অন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও ঢুকে পড়লে কিছু করা যাবে না। এটা মোটেও সুখকর পরিস্থিতি নয়। একেবারেই অনভিপ্রেত ঘটনা।” বিচারপতির প্রশ্ন, “যদি ২২৬ অনুচ্ছেদের অধীনেও পিটিশন গ্রহণযোগ্য না হয়, আর ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনেও না হয়, তবে এই বিষয়টি বিচার করবে কে? ভবিষ্যতে যদি অন্য কোনও মুখ্যমন্ত্রীও এ ভাবে অন্য কোনও দফতরে প্রবেশ করেন, তখন তার বিচার কী ভাবে হবে?”
বিচারপতি মিশ্র স্পষ্ট ভাষায় আরো বলেন, “আপনারা আদালতকে নির্দেশ দিতে পারেন না। রেকর্ডে যা আছে, সবই বিবেচনা করা হবে।” একইসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, “এখানে যেন স্থগিতাদেশ নিয়েই লড়াই চলছে।”
সব যুক্তি শুনে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দেয়, এই মামলার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এ কথাও আদালত জানিয়ে দেয় কেন্দ্রীয় সংস্থার কাজে বাধা দেওয়া হলে তার কোনও প্রতিকার থাকা প্রয়োজন।
এই মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী সপ্তাহে হবে। তবে ইতিমধ্যেই স্পষ্ট,সুপ্রিম কোর্টে এই মামলা শুধু একটি তল্লাশি ঘিরে নয়—বরং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক, তদন্তকারী সংস্থার ক্ষমতা এবং সংবিধানের ব্যাখ্যা—সব মিলিয়ে বড় আইনি লড়াইয়ের চেহারানিতে চলেছে ।